Coronavirus Strikes 2020

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস; জানুন ভাইরাসটির বিস্তারিত

নতুন ধরনের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণে ২৬ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট চীনা কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।  এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্তের রোগীর সংখ্যা ১৯০০ এর অধিক। চীন ছাড়াও অষ্ট্রেলিয়া, জাপান, ফ্রান্স সহ অন্যান্য প্রায় ১২টি দেশে মারাত্মক এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবর দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে নিশ্চিত করেছে।

মহামারী আকারে করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এরই মধ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করেছে।
ইতিমধ্যে পাকিস্তান এবং নেপালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হওয়ায় বাংলাদেশও রয়েছে ঝুঁকিতে।

Coronavirus Infection 2020
Courtesy: Foxnews

চলুন জেনে নেয়া যাক
প্রানঘাতী করোনা ভাইরাসের আদ্যোপান্ত।

করোনাভাইরাস কি?

DNA এবং RNA, এই দুই ধরনের ভাইরাস গ্রুপের মধ্যে RNA গ্রুপের অনেকগুলো ভাইরাসের একটি হলো করোনাভাইরাস। ১৯৬০ সালে এ ভাইরাসটি প্রথম সনাক্ত হয়। করোনা ভাইরাসটির অনেক গুলো প্রজাতি রয়েছে। ২০০২-২০০৩ সালে চীনে SARS ভাইরাসের যে প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিলো, সেটিও এই করোনাভাইরাসেরই একটি প্রজাতি।

বর্তমান করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব

চীনের উহান শহরে ২০১৯ এর ৩০ই ডিসেম্বর প্রথম করোনাভাইরাস “2019-nCoV” আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়। এ বছরের ৭ই জানুয়ারি নতুন প্রজাতির এই করোনাভাইরাসটিকে  নভেল করোনাভাইরাস “2019-nCoV” নামে অভিহিত করা হয়। চাইনিজ কর্তৃপক্ষের ধারনা অনুযায়ী ভাইরাসটি উহান শহরে্র পরিত্যাক্ত সীফুড মার্কেট থেকে ছড়িয়েছে।

করোনাভাইরাসের পূর্ববর্তী প্রাদুর্ভাবঃ

২০০২ সালে চীনের দক্ষিণ অংশের প্রদেশ গুয়াংডং এ করোনাভাইরাসের SARS নামক প্রানঘাতী প্রজাতির সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলো প্রায় ৮ হাজার মানুষ।
সে সময় সার্স আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৯ শতাংশ মৃত্যুবরণ করে।

২০১২ সালে করোনাভাইরাসের অন্য আরেক প্রজাতি,
MERS-CoV এর সংক্রমণ দেখা দেয় সৌদি আরবে।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়াতেও MERS-CoV এর প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গেছে।

এবারের করোনাভাইরাস প্রজাতির ভিন্নতাঃ

৫টি চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত গবেষনার প্রকাশিত ফলাফল থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এবারের “2019-nCoV” ভাইরাসটি আগের দুটি প্রজাতি থেকে ভিন্ন। “2019-nCoV” ভাইরাসটির সাথে  SARS  ভাইরাসের  আচরণগত কিছুটা মিল থাকলেও,
ভিন্নতা রয়েছে ভাইরাস দুটোর জিনোমে।
তাই করোনাভাইরাস প্রজাতির হলেও SARS, MERS-CoV এবং নভেল করোনাভাইরাস “2019-nCoV” তিনটি ভাইরাসই জিনোমের দিক থেকে ভিন্ন।

করোনা ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে সুস্থ্য ব্যাক্তিতে এ ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। সহজভাবে বলতে গেলে, আক্রান্ত ব্যাক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনাভাইরাস অন্য সুস্থ্য মানুষে ছড়াতে পারে। SARS নামক করোনাভাইরাসটি মূলত প্রাণী
(যেমনঃ বাদুর, গন্ধগোকুল) থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়।

চীনে চলমান প্রাদুর্ভাবের কারন হিসেবে পাওয়া 2019-CoV করোনাভাইরাসটির হোষ্ট হিসেবে প্রাথমিক ভাবে সাপ কে সনাক্ত করা হয়েছে। 2019-CoV নভেল করোনাভাইরাসটি
প্রাণী থেকে প্রাণীতে সংক্রমিত হয়, এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে
৫টি চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে প্রকাশিত গবেষনায়।

নতুন প্রজাতির এ ভাইরাসটির ব্যাপারে পুর্নাঙ্গ তথ্য এখন পর্যন্ত না পাওয়া গেলেও প্রাণী থেকে মানুষে এবং আক্রান্ত মানুষ থেকে অন্য মানুষে এ ভাইরাসটি ছড়ায়,
এ তথ্যের প্রমান ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যু হতে পারে?

 SARS বা 2019-CoV ভাইরাস রোগীর শ্বাসতন্ত্রে আক্রমন করে থাকে। যার ফলে এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া বা ফুসফুসে প্রদাহ তৈরি হয়।
এ প্রদাহ বা নিউমোনিয়া জটিল আকার ধারন করলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
পূর্বে SARS ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত নভেল করনাভাইরাস 2019-CoV সংক্রমনে ইতিমধ্যেই ৫৬ জন মারা গেছে।
তাই এ রোগটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার লক্ষণ সমূহঃ

করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের বিশেষ বা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। সর্দি-জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, শরীর ব্যাথা, গলাব্যাথা এবং কিছুক্ষেত্রে ডায়রিয়া হতে পারে করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ। রোগটি মারাত্মক আকার ধারন করলে এসব লক্ষণের পাশাপাশি রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকতে পারে।
এমনক্ষেত্রে রোগীকে আই সি ইউতে স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে।
বয়স্ক বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, এমন ব্যাক্তিরক্ষেত্রে ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষন গুলো তেমনভাবে প্রকাশ নাও পেতে পারে।

রোগনির্ণয়ঃ.

কমন কোল্ডজাতীয় উপসর্গগুলোতে সাধারনত প্রাথমিক ভাবে তেমন পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। রোগীর উপসর্গ পর্যবেক্ষণ এবং শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমেই সাধারনত রোগনির্ণয় করা হয়ে থাকে।
কিন্তু  SARS বা অন্য ধরনের করোনাভাইরাস ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকলে এন্টিবডি বেজড বা পিসিআর বেজড পরীক্ষাগুলোর প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসাঃ

করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষন যেমন নির্দিষ্ট নয়, এ রোগের চিকিৎসা ও তেমনভাবে নির্দিষ্ট নয়। বেশীরভাগ রোগী কোনো বিশেষ ধরনের চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু রোগটি মারত্মক আকার ধারন করলে আই সি ইউ সাপোর্ট পর্যন্ত লাগতে পারে।
SARS প্রাদুর্ভাবের সময়, এর চিকিৎসায়, চীনে রিবাভাইরিন এবং ষ্টেরয়েড ব্যাবহার করা হয়েছিল। রিবাভাইরিন বা ষ্টেরয়েড SARS বা অন্যান্য করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় কার্যকর, এমন প্রমান এখন পর্যন্ত গবেষনালব্ধ নয়।
অন্যান্য ভাইরাসজনিত অন্যান্য অসুখের মতো এ অসুখের চিকিৎসারো মূল লক্ষ্য রোগীর শরীরে অক্সিজেন এবং তরলের মাত্রা ঠিক রাখা এবং রোগীকে যথেষ্ট পরিমানে বিশ্রাম দেয়া।

সাধারণক্ষেত্রে রোগীদের করণীয়ঃ

  • জ্বরের জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ব্যাবহার করা।
  • প্রচুর পরিমানে তরল খাবার খাওয়া।
  • বিশ্রামে থাকা।

 করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা গবেষণায় অগ্রগতি

এন সি বি আই এর তথ্যমতে MERS-CoV আক্রান্ত রোগী থেকে এই ভাইরাসের জিনোম নিয়ে গবেষনার ফলে কিছু বিশেষ ধরনের প্রোটিনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা অদূর ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধকঃ

এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কোনো ভ্যাক্সিন তৈরি করা যায়নি। বিজ্ঞানীরা ভ্যাক্সিন তৈরির জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নভেল করোনাভাইরাস  2019-CoV এর সংক্রমণ প্রতিরোধে সাধারন মানুষদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্ষ

১. সাবান বা এলকোহল বেজড হ্যান্ড রাব দিয়ে বার বার হাত ধৌত করা।

২. হাচি বা কাশি দেবার সময় হাত বা টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে হাচি বা কাশি দেয়া। এ সময়ে ব্যাবহার করা টিস্যূ দ্রুতো ডাষ্টবিনে ফেলে দেয়া এবং সাথে সাথে হাত ধুয়ে ফেলা।

৩. জ্বর এবং কাশিতে আক্রান্ত রোগীর, নিকট সংস্পর্শ পরিহার করা।

৪. জ্বর কাশি এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে দ্রুতো ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহন করা এবং নিকট অতীতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত এলাকায় ভ্রমনের তথ্য থাকলে তা ডাক্তারকে জানানো।

৫. করোনাভাইরাস আক্রান্ত এলাকার প্রানীদের সরাসরি স্পর্শ থেকে বিরত থাকা।

৬. কাচা বা কম রান্না হওয়া প্রাণীজ খাবার পরিহার করা। প্রানীজ খাবার যেমন, মাংস, দুধ ইত্যাদি প্রস্তুতকালীন নাড়াচাড়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা।

লিখেছেন
ডাঃ মোহাম্মদ শাকিলুজ্জামান
জেনারেল ফিজিশিয়ান

     সূত্রঃ

Share On
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares
  •  
    16
    Shares
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *