হাই ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রন করতে নিয়মিত ব্লাড প্রেশার চেক করুন।

হাই ব্লাড প্রেশার/উচ্চ রক্তচাপ/হাইপারটেনশন, ভুল ধারনায় আমরা…২য় (শেষ পর্ব)

 আপনি জানেন কি? সারাবিশ্বে, ১১৩ কোটি লোক হাই ব্লাড প্রেশার, হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যায় ভুগছে!!!

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার, এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্রেন ষ্ট্রোক, হার্ট এটাকের শিকার হচ্ছে,  কিডনী নষ্ট বা অন্ধত্ব বরণ করতে হচ্ছে কতো কতো মানুষকে, ধারনা আছে আপনার?

ব্লাড প্রেশার জনিত সমস্যা গুলোর ব্যাপারে প্রচলিত ভুল ধারনা গুলো নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনের ২য় এবং শেষ পর্ব।

প্রথমেই জেনে নেয়া যাক ব্লাড প্রেশারের প্রাথমিক ৪টি বিষয়।
১। ব্লাড প্রেশারের দুটো অংশ, সিষ্টোলিক (যা সাধারণ মানুষ “উপরের প্রেশার” যেমন ১২০, বলে থাকে) এবং ডায়াষ্টোলিক প্রেশার (যা সাধারণ মানুষ “নীচের প্রেশার” যেমন ৮০, বলে থাকে)।
২। প্রাপ্তবয়স্কদের নরমাল ব্লাড প্রেশারঃ  ১২০/৮০ মিমি অব মারকারি এর সমান বা কম।
৩। যাদের সিষ্টোলিক ব্লাড প্রেশার ১২০ এর বেশী, কিন্তু ১৩০ এর কম, এবং ডায়াষ্টোলিক ব্লাড প্রেশার ৮০ বা তার নীচে,)(যেমন ১২৯/৮০ মিমি অব মারকারি), তাদের ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিক নয়, আবার তারা প্রেশারের রোগী ও নন।
৪। যাদের ব্লাড প্রেশার ১৩০/৮০ বা এর বেশী, নতুন আমেরিকান গাইড লাইন অনুযায়ী তারা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের রোগী। [১]

ভুল ধারনা-১। “আমারা হাই ব্লাড প্রেশারের সমস্যা আছে, কিছুদিন ওষুধ খাওয়ার পর এখন প্রেশার নিয়ন্ত্রনে আছে, তাই ওষুধ বন্ধ রেখেছি…”

হাইপারটেনশন সাধারণত সারা জীবনের অসুখ, সারে না, কেবল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ওষুধ ছাড়া যদি নিয়ন্ত্রণে থাকতো, তাহলে ডাক্তার সাহেব আপনাকে প্রেশারের ওষুধ দিতেন না। ওষুধ ব্যাবহার না করে আপনি হয়তো মাঝে মধ্যে মেপে নরমাল পাচ্ছেন প্রেশার, কিন্তু বাকী সময়? নিয়ন্ত্রণে থাকছে, আপনি নিশ্চিত? প্রেশারের ওষুধ চলছিলো বলেই প্রেশার নিয়ন্ত্রনে ছিলো, বন্ধ রেখেছেন, আবার বাড়বে, ভেতরে ভেতরে ক্ষতি হতে থাকবে, আপনি বুঝবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রেশারের ওষুধের ডোজ অবস্থা অনুযায়ী কমানো বা বাড়ানো যেতে পারে কেবল, বন্ধ নয়, তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সব ধরনের ওষুধের হোমডেলিভারী পেতেঃ

Order Now

ভুল ধারনা-২। “আমার হাই ব্লাড প্রেশারের সমস্যা আছে, ২/৪/৬ মাস পরে ডাক্তারের কাছে গেলে উনিই প্রেশার মেপে দেখেন, এতেই চলে, বাসায় মাপার দরকার কি?”

ডায়াবেটিসে যেমন ব্লাড সুগার উঠানামা করে, ব্লাড প্রেশার ও তেমনি বাড়ে, কমে, স্বাভাবিক থাকে, বিভিন্ন শারীরিক অবস্থায়। তাই বাসায় নিয়মিত প্রেশার চেক করে  লিখে রাখা উচিত, (একই সময়ে প্রেশার মাপা ভালো, আজ সকালে, পরশু বিকেলে, অন্যদিন রাতে, এভাবে নয়)। পরবর্তীতে ডাক্তারের দেখানোর সময় সেই রেকর্ড নিয়ে গেলে উনার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে যে, চিকিৎসা ঠিক পথে আছে, নাকি কোনো পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

ভুল ধারনা-৩। “হাই প্রেশারের সমস্যা আছে আমার, ডাক্তার লবণ খেতে নিষেধ করেছেন, তারপর থেকে কাচা লবণ বাদ দিয়ে ভাজা লবণ খাচ্ছি, লবণ ভেজে খেলে সমস্যা হয় না, তাই…”

কাচা লবণ, ভাজা লবণ আর সেদ্ধ লবণ, আপনি যে ভাবেই লবণ খেয়ে থাকুন না কেনো, লবণ থাকবে লবণের মতোই। তাই ক্ষতি ও করবে একই রকম। হাই ব্লাড প্রেশারের রোগীদের লবণ খাওয়া একদমই উচিত নয়। ৪ জনের পরিবারের খাবারে, সারাদিনে, এক চামচের বেশী লবণের ব্যাবহার উচিত নয়। সুস্থ্য থাকতে চাইলে, পানসে খাবারে অভ্যস্ত হোন।

ভুল ধারনা-৪। “আমার হাই ব্লাড প্রেশার আছে, ঠান্ডা-কাশির ট্যাবলেট,সিরাপ ফার্মেসী থেকে কিনে খাই, এতে প্রেশারের সমস্যা হবার কিছু নেই…”

ঠান্ডা-কাশির চিকিৎসায় ব্যাবহৃত ওটিসি মেডিসিন গুলোর অনেক গুলোতে ডিকনজেষ্টেন্ট ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। ডিকনজেষ্টেন্ট আপনার ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই সব ধরনের ঠান্ডা কাশির ওষুধ আপনার জন্য নয়।

ভুল ধারনা-৫। “ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই জন্ম বিরতিকরন পিল ব্যাবহার করি, এতে সমস্যা হবার কিছু নেই…”

জন্ম বিরতিকরন পিল মহিলাদেরক্ষেত্রে হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, আর যে সব মহিলাদের হাইপারটেনশন আছে, জন্মবিরতিকরণ পিল ব্যাবহার তাদের জন্য বড়ো ধরনের ক্ষতির কারন হয়ে দাড়াতে পারে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া জন্মবিরতিকরণ পিল ব্যাবহার করা ঠিক নয়।

ভুল ধারনা-৬। “সকাল থেকে ঘাড় ব্যাথা হচ্ছে, নিশ্চয়ই আমার প্রেশার বেড়েছে…”

বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ঘাড়ের মাংস্পেশী, স্পাইন, বা রক্তনালির সমস্যা থেকে ঘাড় ব্যাথা হয়ে থাকে। ঘাড় ব্যাথা হলেই তা প্রেশার বাড়ার কারনে হচ্ছে, এমন ভাবা ঠিক নয়। বার বার ঘাড় ব্যাথা হলে তা প্রেশার বাড়ার কারনে হচ্ছে, এমনটা না ভেবে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

ভুল ধারনা-৭। “তেতুল খেলে প্রেশার কমে”

প্রেশার বেড়ে যখন রোগীর অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে, কিছু মানুষ, তাদের ভুল ধারনা থেকে, পানিতে তেতুল গুলিয়ে রোগীকে খেতে দিয়ে থাকেন। এতে করে প্রেশার তো কমেই না, বরং বমির ভাব সহ আরো কিছু জটিলতা তৈরি হয়। এতে প্রেশার আরো বেড়ে গিয়ে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। তেতুল খেলে প্রেশার কমে, এ ধারনা সম্পূর্ণ ভূল।

ভুল ধারনা-৮। “প্রেশার বেশী থাকে আমার, তাই সবাই বলে দুধ, ডিম খাওয়া নিষেধ আমার…”

দুধ, ডিম এগুলো পুষ্টিকর খাবার। দুধ, ডিম খেলে প্রেশার বাড়ে, এ ধারনা থেকে এসব খাওয়া বাদ দেয়া ঠিক নয়। দুধের সর, ডিমের কুসুম এগুলো বাদ দিয়ে দুধ, ডিম খাওয়া আপনার জন্য ক্ষতিকর নয়।

ভুল ধারনা-৯। “প্রেশারের রোগীদের ব্যায়াম, হাটা নিষেধ, প্রয়োজন শুধু বিশ্রাম… “

হার্ট এটাক সম্পর্কিত লিখায় লিখেছিলাম, হার্টকে সুস্থ্য রাখতে গেলে মাঝারি ধরনের ব্যায়ামের বিকল্প নেই। হাই ব্লাড প্রেশার আছে, এমন রোগীদের অন্তত ৩০ মিনিট প্রতিদিন হাটা অত্যাবশকীয়। হালকা জগিং, সাইকেল চালানো, অবসরে সাতার কাটা ইত্যাদি হতে পারে হাইপারটেনশনের রোগীদের জন্য ভালো ধরনের ব্যায়াম।

ভুল ধারনা-১০। “ব্লাড প্রেশার মেপেছি, ১২০/১০০ পেয়েছি, ১২০ মানে নরমাল, তারমানে প্রেশার নিয়ন্ত্রনেই আছে…”

উপরে লিখেছি, ব্লাড প্রেশারের রিডিং এর দুটো অংশ, একটা সিষ্টোলিক, অন্যটা ডায়াষ্টোলিক। ১২০/১০০ পেয়েছেন, এক্ষেত্রে সিষ্টোলিক অংশ নরমাল, ডায়াষ্টোলিক বিপি ১০০, যা স্বাভাবিক নয়, বরং বেশী। তাই এটাকে নিয়ন্ত্রিত ব্লাড প্রেশার বলা যাবে না। সহজ কথায়, ব্লাড প্রেশারের দুটো অংশকেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

ভুল ধারনা-১১। “আমার ব্লাড প্রেশার লো বা কম থাকে, এটা ক্ষতিকর কিছু নয়, প্রেশার বাড়লে ক্ষতি, কমলে নয়…”

প্রেশার খুব কম থাকলে বা হঠাৎ করে খুব কমে গেলে মাথা ঘুরানো, ঝাপ্সা লাগা, অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া সহ নানা ধরনের জটিলতা হতে পারে৷ অনেকের ব্লাড প্রেশার কম থাকে, যা তাদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ভুল নয়, সঠিক তথ্য জানুন,
নিজে সুস্থ্য থাকুন।

লিখেছেনঃ

ডাঃ মোহাম্মদ শাকিলুজ্জামান

জেনারেল ফিজিশিয়ান

লেখক পরিচিতি

আরো পড়ুনঃ

হাই ব্লাড প্রেশার/উচ্চ রক্তচাপ/হাইপারটেনশন, ভুল ধারনায় আমরা…১ম পর্ব

তথ্যসূত্রঃ [১]

American Heart Association

আজ এ পর্যন্তই, আগামী পর্বে থাকছে ক্যান্সার নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারনা নিয়ে তথ্য।

স্বাস্থ্য বিষয়ক লিখাগুলো নিয়মিত পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক বা ফলো করুন, অথবা আমাদের ব্লগ পেইজে সাবস্ক্রাইব করুন।

Share On
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares
  •  
    27
    Shares
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •